বাহুবলে জিরো থেকে হিরো উপজেলা পরিষদের কম্পিউটারম্যান ‘মিঠু

সিলেট বিডি নিউজ
প্রকাশিত ২, এপ্রিল, ২০২১, শুক্রবার
বাহুবলে জিরো থেকে হিরো উপজেলা পরিষদের কম্পিউটারম্যান ‘মিঠু

বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা পরিষদের সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে বাম দিকে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের অফিস পার হয়েই একটি রাজকীয় অফিস চোঁখে পড়ে সেটা হল উপজেলা পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর কনক দেব মিঠু’র।

তার রাজকীয় অফিস দেখলে বুঝা যায় কোন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার অফিস। তার বেশ ভোষন তো প্রশাসনিক ক্যাডারের মত! সে অফিস করছে উপজেলা চেয়ারম্যান গণের অফিসে বসে।

সেই অফিসের চেয়ারে বসে দুই হাতে কামাই করছেন অবৈধ টাকা, কখনো উপজেলা পরিষদ কখনো উপজেলা প্রশাসন থেকে। যখন যেখানে যাকে কাজে লাগানো যায় সেখানেই কাজে লাগিয়ে হয়েছেন বিশাল অর্থ বিত্তের মালিক।

তিনি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়কাটা ও অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তুলছেন মাসিক মসোহারা। জাইকার ট্রেনিং এর নামে টাকা উত্তোলন করে নিজের পকেটে রেখেই নাম মাত্র ট্রেনিং দেখিয়ে আত্বসাৎ করেছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। সম্প্রতি কৃষি জমি থেকে ইটভাটার মালিকরা মাঠি নিতে তাকে ম্যানেজ করতে হয়েছে, মিঠু ম্যানেজ হলেই যেন সব ম্যানেজ।

বইমেলার নাম দিয়ে ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে আত্বসাৎ করেছেন লাখ লাখ টাকা। জাইকাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষন দেখিয়ে তিনি পকেট ভরছেন টাকা দিয়ে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও কে ভুল ভুল বুঝিয়ে চালাক মিঠু দুই হাতে কামাচ্ছে টাকা।
সরকারী বিভিন্ন কাজ তিনি নিজের হাতে করছেন, ব্যবসা করছেন ইট বালু পাথরের। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রংয়ের কাজ আসবাবপত্র কিনাসহ সবই করছেন নিজ হাতে। দরদাম নিজের মত করে ভাউচার বানিয়ে স্বাক্ষর নিচ্ছেন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার।

ইউএনও কে ম্যানেজ করেই এগুলি করছেন মিঠু! তিনি মন মত টাকা না পেলে ইউএনও কে ম্যানেজ করে সেখানে পাঠিয়ে দেন ভ্রাম্যমান আদালত। মাঝে মাঝে তিনিও ভ্রাম্যমান আদালতের সাথে সেখানে উপস্থিত হন, তার পাওয়ার দেখান সেখানে! আসতে থাকে টাকা।

তিনি উপজেলা পরিষদের কম্পিউটার হয়ে কিভাবে কোন ক্ষমতায় ইউএনও অফিসের কাজ করেন এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে চলছে তোলপাড়।

কে সেই মিঠু বাহুবল উপজেলার দক্ষিণ বাহুবল গ্রামের যাত্রীবাহি বাসের হেলপার কমলেষ দেব পুত্র কনক দেব মিঠু ।

বাবার অনটনের সংসারের টানাপোড়েনে বাসের হেলাপার হিসেবে অতিকষ্টে সংসারের হাল ধরে রাখেন। কষ্ট করে পুত্রকে পড়ালেখা করান। এরই মাঝে আর্শিবাদপুষ্ট হন আব্দুল কাদির চৌধুরী। ২০১২ সালে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির চৌধুরীর সময়ে উপজেলা পরিষদে কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগলাভ করেন মিঠু।

মূলত: তার সুদৃষ্টিতেই নিয়োগপ্রাপ্ত হন কনক দেব মিঠু। এই কর্মজীবনের ৯ বছরের মাথায় মিঠু এখন কোটিপতি।

এখন তার হয়েছে আলিশান বাড়ি, রুমে রয়েছে হাই প্রোফাইল এসি, বসতঘর সহ বাড়ির আঙ্গিনা পাকাকরণসহ মিলিয়ে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। রয়েছে নামে বেনামে সম্পত্তিও। তার চাকুরি রাজস্বভূক্ত না হলেও পরিষদ থেকে সর্বসাকুল্যে বেতন পান মাত্র ১৫ হাজার টাকা।

পরবর্তী সময়ে সুচতুর কনক দেব মিঠু নিজের আখের গোছাতে উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির আশির্বাদপুষ্ট হয়ে যান। ফলে তার হাতে মুঠোয় ধরা দেয় অর্থ নামক সোনার হরিণ।

অর্থ বিত্ত অর্জন করে এবার বিয়ের পালা। গত বছরের ২৭ নভেম্বর বিবাহ কার্য সম্পন্ন করেন তিনি। রাজকীয় অবস্থায় বিয়ে করেন নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউক বাজারের বাসিন্দা নারায়ণপালের কন্যা রিমা পালকে।
বিয়েতে উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিসহ প্রায় তিন হাজার মানুষ অংশ গ্রহন করেন। এ বিয়েতে খরচ করেছেন প্রায় অর্ধ কোটি  টাকা।

নতুন বধুকে নিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতেই সিলেট থেকে বিমানযোগে কক্সবাজারে হানিমুনে যান মিঠু দম্পতি। সেখানে কয়েকদিন আনন্দ উপভোগের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে পিকনিক স্পটে ঘুরতে গিয়েছেন কয়েকবার।

কিন্তু এত অর্থ বিত্তের মালিক কেমন করে হলেন মিঠু? এই প্রশ্নটিই সচেতন মানুষের মুখে মুখে চাউর। তার স্ত্রীকে নিয়ে বিমানে ঘুরানোর ছবি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। অনেকেইে ফেসবুকে পোষ্ট করে তার দুর্নীতির বিচার চান।

গত ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের এডিপি আওতাধীন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন কর্মকর্তাদের নিয়ে ম্যানেজমেন্ট উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু করোনার কারনে তা হয়নি।

পরিষদের এক কর্মচারী জানান- এই টাকা বই মেলার জন্য রাখা হয়েছিল। প্রতি বছরই এমন হয়। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি তো বই মেলা হলো না। তাহলে টাকা গেল কোথায়? যে সভা করা হয়েছে সভার পার্টিশিপেটদের সম্মানী বাবদ ২ হাজার টাকাও কেটে রাখা হয়েছে।

সুচতুর মিঠু উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে, ভুয়া বিলভাউচার বানিয়ে আত্বসাৎ করেন। উদ্বুদ্ধ করনের সভার সম্মানি দুই হাজারও পাননি উপজেলা চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান।

জাইকা প্রজেক্টের নামে প্রশিক্ষনের টাকাও আত্বসাৎ করেছেন মিঠু।

উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, জাইকার ১০/১৫ লাখ টাকা নামকোয়াস্তে একটি ট্রেনিং দেখিয়ে সে টাকাগুলি আতœসাৎ করেছে।

উপজেলা পরিষদের সিএ’র অফিস জরাজীর্ণ  হলেও উপজেলা প্রশাসনের আশির্বাদপুষ্ট মিঠুর অফিস রাজকীয়।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বইমেলাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন আর্থিক নির্ভর অনুষ্ঠানাদির পরিচালনার হাত থাকে মিঠুরই। এক্ষেত্রে স্বীকার করতেই হবে যে, মিঠুর রয়েছে কর্মকর্তাদের সুনজর অর্জনের বৃদ্ধিবৃত্তিক কৌশল।

উপজেলা প্রশাসনের অন্য একজন কর্মকর্তা জানান, আপনারা লিখেন, তদন্ত আসলে সব অফিসাররাই তার বিষয়ে মুখ খুলবেন। মিডিয়ায় তারা মুখ খুলতে চাননি।

কনক দেব মিঠু এলাকার ছেলে হওয়ায় সকলের সাথেই রয়েছে তার সম্পর্ক। প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক লোকদের অবৈধ সুযোগ সুবিধা দিয়ে তাদের নিজের কব্জায় রেখেছে সে। তার মাধ্যমেই উপজেলা প্রশাসনের বড় কর্তারা অবৈধ সুবিধা ভোগ করেন।

বাস হেলপারের ছেলে মিঠুর এমন বিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল। অনেকেই কমেন্ট করে তার বিশাল অর্থ বিত্তের হিসাব চাইছে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে।

এদিকে মিঠু যে রাজকীয় অফিসের চেয়ারে বসে অফিস করছে সেটা ছিল সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাই’র।
এ ব্যাপারে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বলেন, আমি চেয়ারম্যান থাকাকালিন সময়ে মিঠু তার অফিস কক্ষ সাজানোর কোন বাজে দেয়া হয়নি। চেয়ারম্যানের চেয়ার ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে চেয়াররের কথা বলছেন সেটি আমার আগের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির চৌধুরী ব্যবহার করেছেন, পরবর্তীতে আমি কিছুদিন ব্যবহার করেছি। সেই চেয়ারটি যদি মিঠু ব্যবহার করে থাকে তাহলে সেটা চরম বেয়াদবী এবং এখতিয়ার বহি:র্ভূত।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহি অফিসার স্নিগ্ধা তালুকদার এ বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি! এক পর্যায়ে তিনি বলেন, সে যেহেতু উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের সিএ তাহলে উনাকেই জিজ্ঞেস করুন।

বাহুবল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ খলিলুর রহমান বলেন, আমি দুই বছর হয়েছে চেয়ারম্যান পদে আছি, দুই বছরে মিঠুকে মাত্র একদিন আমার সাথে নিতে পেরেছি, এই তো সেদিন ঝড়ের খোঁজ খবর নিতে সে গিয়েছিল আমার সাথে। তিনি বলেন, সে আমার অফিসের লোক হলেও সে কাজ করে ইউএনও অফিসের, তাদের সাথে সে ভ্রাম্যমান আদালতেও যায়।

কেন আপনার অফিসের কাজ পেলে অন্য অফিসের কাজ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অনেকবার বারন করেছি, সে শুনেনি আমার কথা, আমি তো তার গায়ে আর হাত তুলতে পারিনা। কেন ইউএনও সাহেব তাকে বার বার বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন সে কারন আমার জানা নেই।

চেয়ারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিঠুর অফিস কক্ষটি আমি চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই সাজিয়েছিল। সাবেক চেয়ারম্যান গণের চেয়ার মিঠু কোনভাবেই ব্যবহার করতে পারেনা। এটা খুব নিন্দনীয় কাজ।

 3,568 total views

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 24
    Shares
error: Content is protected !!